ঢাকা, মঙ্গলবার ১১, আগস্ট ২০২৬ ১৭:১৯:৫৮ পিএম

First woman affairs online newspaper of Bangladesh : Since 2012

Equality for all
Amin Jewellers Ltd. Gold & Diamond
শিরোনাম
পদ্মার স্রোতে জাজিরায় তীব্র ভাঙন, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় অংশ অপুষ্টির ঝুঁকিতে! হুমায়ূন আজাদ: প্রথাবিরোধী, সাহস ও সৃষ্টির অদম্য লেখক স্ত্রীসহ সৌরভ গাঙ্গুলীকে হত্যার হুমকি, তদন্তে পুলিশ লেখক-শিক্ষক মেঘনা গুহঠাকুরতার জন্মদিন আজ কলম্বিয়ায় ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ১৩২, জরুরি অবস্থা ঘোষণা

দেশে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় অংশ অপুষ্টির ঝুঁকিতে! 

| উইমেননিউজ২৪

প্রকাশিত : ১১:৪৫ এএম, ১১ আগস্ট ২০২৬ মঙ্গলবার

সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

অপুষ্টির দীর্ঘমেয়াদি ছাপ পড়ছে শারীরিক ও মানসিক বিকাশে। বাংলাদেশে শিশুদের অপুষ্টি কমানোর ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের একটি বড় অংশ এখনো অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শতাংশ শিশু খর্বকায় (stunted)। অর্থাৎ, প্রায় প্রতি চার শিশুর একজন বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত উচ্চতা অর্জন করতে পারছে না। 

খর্বকায় হওয়া শুধু একটি শিশুর উচ্চতা কম থাকার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘদিনের বা বারবার হওয়া অপুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। পর্যাপ্ত পুষ্টি, সংক্রমণ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুর যত্নের ঘাটতি দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, stunting শিশুদের শারীরিক ও জ্ঞানীয় বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। 
অপুষ্টির আরেক চিত্র ‘ওয়েস্টিং’
MICS ২০২৫-এর তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১২.৯ শতাংশ wasting বা ক্ষীণকায়তায় ভুগছে। অর্থাৎ বয়সের তুলনায় উচ্চতা অনুযায়ী তাদের ওজন অনেক কম। এটি সাধারণত সাম্প্রতিক ও তীব্র অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত শিশু অপুষ্টির বৈশ্বিক হিসাবের মানদণ্ড অনুযায়ী, ১০ শতাংশের বেশি wasting-কে উচ্চমাত্রার সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 
এ ছাড়া দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৩ শতাংশ শিশু underweight বা বয়সের তুলনায় কম ওজনের। বিপরীতে প্রায় ১.৭ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজনের। অর্থাৎ বাংলাদেশে একই সঙ্গে অপুষ্টির একাধিক রূপ বিদ্যমান। 
দারিদ্র্যের সঙ্গে অপুষ্টির সরাসরি সম্পর্ক
শিশু খর্বকায় হওয়ার পেছনে পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখছে। MICS ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে খর্বকায় হওয়ার হার ৩২ শতাংশ, যেখানে সবচেয়ে ধনী পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে তা ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে শিশুর পুষ্টির ব্যবধান স্পষ্ট। 
শুধু পরিবারের আয় নয়, মায়ের শিক্ষার সঙ্গেও এ ব্যবধান রয়েছে। যেসব শিশুর মায়ের শিক্ষা প্রাক-প্রাথমিক বা কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পর্যায়ে নেই, তাদের মধ্যে খর্বকায় হওয়ার হার ৩৪ শতাংশ। উচ্চশিক্ষিত মায়েদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১৫ শতাংশ। 
এর অর্থ হলো-শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে শুধু খাদ্য সরবরাহ করলেই হবে না; মায়ের শিক্ষা, পুষ্টিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ, শিশুর পরিচর্যা এবং পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধান
গ্রামীণ এলাকাতেও সমস্যা তুলনামূলক বেশি। MICS ২০২৫ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বকায় হওয়ার হার ২৫ শতাংশ, শহরাঞ্চলে ২২ শতাংশ। 
তবে শহর মানেই যে শিশুর পুষ্টি পরিস্থিতি ভালো। এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়। শহরের দরিদ্র বস্তি ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোতে খাদ্যের দাম, বাসস্থানের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতা শিশুদের অপুষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিভাগভেদেও বড় পার্থক্য
দেশের সব অঞ্চলে পরিস্থিতি এক নয়। MICS ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে খর্বকায় শিশুর হার সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ। বরিশাল ও চট্টগ্রামে এ হার ২৬ শতাংশ করে, ময়মনসিংহে ২৫ শতাংশ। রাজশাহী ও রংপুরে ২৩ শতাংশ, ঢাকায় ২২ শতাংশ এবং খুলনায় সর্বনিম্ন ২১ শতাংশ। 
এই আঞ্চলিক বৈষম্য দেখায়, জাতীয় গড় দিয়ে পুরো দেশের পুষ্টি পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। অঞ্চলভেদে দারিদ্র্য, খাদ্যাভ্যাস, কৃষি ও খাদ্যের প্রাপ্যতা, স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য, পানি-স্যানিটেশন এবং সামাজিক বৈষম্য বিবেচনায় নিয়ে আলাদা কর্মসূচি প্রয়োজন।
পেট ভরলেই পুষ্টি নিশ্চিত হয় না
শিশু অপুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো খাদ্যের বৈচিত্র্যের অভাব। শুধু ভাত বা শর্করাভিত্তিক খাবার দিয়ে শিশুর প্রয়োজনীয় প্রোটিন, আয়রন, জিংক, ভিটামিন ও অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট নিশ্চিত করা যায় না।
UNICEF-এর তথ্য অনুযায়ী, ৬–২৩ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ২৯.৫ শতাংশ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য খাদ্য (minimum acceptable diet) পাচ্ছে। একই বয়সী শিশুদের ৬৪.৮ শতাংশ শিশু খাদ্য-দারিদ্র্যের (child food poverty) মধ্যে রয়েছে। 
এই বয়সটি শিশুর শারীরিক ও মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ সময়ে পর্যাপ্ত ও বৈচিত্র্যময় খাবারের অভাব ভবিষ্যতে শিশুর শেখার সক্ষমতা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও সামগ্রিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
মায়ের পুষ্টি ও শিশুর পুষ্টি একই সূত্রে বাঁধা
শিশুর অপুষ্টির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করতে হবে শিশুর জন্মেরও আগে। গর্ভাবস্থায় মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ এবং নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করা জরুরি।
জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে একচেটিয়া বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৬.৬ শতাংশ। 
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর প্রথম ১,০০০ দিন—গর্ভধারণ থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত—পুষ্টির দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে পুষ্টির ঘাটতি হলে পরবর্তী সময়ে তা পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
কেন খর্বকায় শিশুর সংখ্যা এখনো এত বেশি?
শিশু খর্বকায় হওয়ার পেছনে একটি মাত্র কারণ নেই। এর সঙ্গে জড়িত-
• পরিবারের দারিদ্র্য ও খাদ্য কেনার সীমিত সক্ষমতা
• মায়ের অপুষ্টি ও রক্তস্বল্পতা
• শিশুর জন্মের সময় কম ওজন
• অপর্যাপ্ত বুকের দুধ ও পরিপূরক খাবার
• খাদ্যে বৈচিত্র্যের অভাব
• বারবার ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ
• নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি
• শিশুর পরিচর্যা ও পুষ্টি বিষয়ে জ্ঞানের অভাব
• বাল্যবিয়ে ও কিশোরী মাতৃত্ব
• স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আর্থিক বৈষম্য
• জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি।
বাংলাদেশে শিশু খর্বকায় হওয়ার প্রবণতা কমেছে—এমন প্রমাণ আগের গবেষণাতেও পাওয়া গেছে। তবে দরিদ্র পরিবার, কম শিক্ষিত মায়ের সন্তান, গ্রামীণ শিশু ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধার সঙ্গে অপুষ্টির সম্পর্ক এখনো গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। 
শুধু খাবার দিলেই সমাধান হবে না
শিশু অপুষ্টি মোকাবিলায় সরকারের পুষ্টি কর্মসূচির পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও পুষ্টিনির্ভর করতে হবে। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারী ও কিশোরীদের পুষ্টি নিশ্চিত, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী, শিশুর জন্মের পর নিয়মিত বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ এবং অপুষ্ট শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের জন্য ডিম, দুধ, মাছ, ডাল, শাকসবজি, ফলসহ স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য পুষ্টিকর খাবারের বিষয়ে পরিবারগুলোকে বাস্তবভিত্তিক পরামর্শ দিতে হবে। শুধু ‘পুষ্টিকর খাবার খান’ বললে হবে না-কম খরচে কীভাবে পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা যায়, সেটিও শেখাতে হবে।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গে শিশু অপুষ্টির হারও আরও দ্রুত কমে আসা প্রত্যাশিত। কিন্তু ২০২৫ সালের MICS-এর তথ্য বলছে, দেশের প্রতি চার শিশুর প্রায় একজন এখনো খর্বকায়। একই সঙ্গে প্রতি আটজনের একজনের মতো শিশু wasting-এ আক্রান্ত এবং প্রায় প্রতি চারজনের একজন underweight। 
এ অবস্থায় শিশুপুষ্টিকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা পুষ্টি বিভাগের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি-স্যানিটেশন, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি ও দারিদ্র্য বিমোচন-সব নীতির সঙ্গে শিশুপুষ্টিকে যুক্ত করতে হবে।
কারণ একটি শিশু যখন বয়স অনুযায়ী বেড়ে উঠতে পারে না, তখন ক্ষতিটা শুধু তার বর্তমান শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়তে পারে তার শেখার ক্ষমতা, ভবিষ্যৎ কর্মদক্ষতা, আয়ক্ষমতা এবং সামগ্রিক জীবনমানের ওপর। তাই ২৪ শতাংশ খর্বকায় শিশুর এই পরিসংখ্যান কেবল একটি স্বাস্থ্য-পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও UNICEF-এর Bangladesh Multiple Indicator Cluster Survey (MICS) 2025 প্রাথমিক প্রতিবেদন ও পুষ্টিবিষয়ক তথ্য।